প্রতিরক্ষা বাহিনী

অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের জীবনী

A biography of Admiral Farid Habib

Table of Contents

ভূমিকাসেই শীতের সকাল, যখন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ইতিহাসে লেখা হলো নতুন অধ্যায়

২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি। ঢাকা সেনানিবাসের নৌ সদর দপ্তর “বিএনসি বরিশাল” প্রাঙ্গণে সেদিন সকালটা ছিল অন্য রকম। নীল-সাদা পতাকা হালকা বাতাসে দোল খাচ্ছিল। পূর্ণ নৌ সাজে দাঁড়িয়ে ভাইস অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের কাঁধে তুলে দেওয়া হলো অ্যাডমিরালের ব্যাজ — চারটি সোনালী তারা। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নৌপ্রধানকে চার-তারকা অ্যাডমিরাল পদে উন্নীত করা হলো। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই বিরল সম্মান পেলেন তিনি। তাঁর হাতে উঠল নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ পদমর্যাদার প্রতীক।

১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি ব্রিটেনের ডার্টমাউথ থেকে যে তরুণ অফিসার কমিশন পেয়েছিলেন, তিনি আজ পৌঁছেছেন নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ শিখরে। টাঙ্গাইলের কালিহাতীর ইছাপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই সেনানী প্রমাণ করলেন — কঠোর পরিশ্রম, সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে যেকোনো স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যায়।

এই ২৮ অধ্যায়ের মহাকাব্যে ফুটে উঠবে সেই যাত্রার কাহিনি — ইছাপুর গ্রামের শিশু থেকে নৌবাহিনীর প্রথম চার-তারকা অ্যাডমিরাল, যেখানে আছে কঠিন প্রশিক্ষণ, দেশসেবার অঙ্গীকার, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, এবং এক অনন্য উত্তরাধিকার। এটি শুধু একটি জীবনী নয়, এটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের একটি দলিল।

অধ্যায় ১: ১৯৫৯ — টাঙ্গাইলের ইছাপুর গ্রামে এক ভবিষ্যৎ নৌসেনার জন্ম

১৯৫৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার ইছাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদ হাবিব। পিতা প্রয়াত মোহাম্মদ আলী ছিলেন সরকারের উপসচিব — একজন দক্ষ প্রশাসক ও সৎ কর্মকর্তা। মাতা ছিলেন গৃহিণী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী। ফরিদ হাবিব ছিলেন পিতামাতার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। বাবা সরকারি চাকরির সুবাদে টাঙ্গাইল, ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় বদলি হতেন, তাই ফরিদের শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। এই ভ্রাম্যমান জীবন তাঁকে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের সাথে পরিচিত করিয়েছে।

ইছাপুর গ্রাম ছিল টাঙ্গাইলের সবুজ প্রকৃতির মাঝে অবস্থিত একটি সাধারণ কৃষিপ্রধান গ্রাম। ছোটবেলা থেকেই ফরিদ ছিলেন মেধাবী, দৃঢ়চিত্ত ও নিয়মানুবর্তী। বাবার কাছ থেকে তিনি দেখেছেন সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার উদাহরণ। মা তাঁকে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েছেন।

ছোটবেলায় তিনি বাবার কাছে শুনতেন দেশের মুক্তিযুদ্ধের গল্প, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কাহিনি, পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার ও বাঙালির বীরত্বের কাহিনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ফরিদের বয়স প্রায় ১২ বছর। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার, দেখেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, শুনেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতারের গান। সেই চেতনা তাঁর মনে গেঁথে যায়। তিনি বুঝতে পারেন — এই দেশের সেবা করতে হলে তাকে সশস্ত্র বাহিনীতেই যেতে হবে।

বাবা মোহাম্মদ আলী চেয়েছিলেন ছেলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হোক, কিন্তু ফরিদের আকর্ষণ ছিল নীল সমুদ্র ও যুদ্ধজাহাজের দিকে। টাঙ্গাইলে সমুদ্র নেই, কিন্তু স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে নৌবহরের গল্প পড়ে তিনি এক অদেখা টান অনুভব করতেন। একদিন তিনি বাবাকে বলেছিলেন, “বাবা, আমি বড় জাহাজ চালাব। দেশের সীমানা পাহারা দেব।” বাবা তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

অধ্যায় ২: ১৯৬৬-১৯৭৬ — স্কুলজীবন নৌবাহিনীর স্বপ্ন দেখা

ফরিদ হাবিবের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা টাঙ্গাইল ও ঢাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সম্পন্ন হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। গণিত, ইংরেজি ও ইতিহাসে তাঁর দখল ছিল অসাধারণ। শিক্ষকেরা তাঁকে ‘শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন’ ছাত্র হিসেবে চিহ্নিত করতেন। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তিনি দৌড় ও সাঁতারে অংশ নিতেন।

১৯৭৬ সালে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। সেই সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনী অফিসার ক্যাডেট নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নিচ্ছে। ফরিদ আবেদন করেন এবং কঠিন লিখিত, শারীরিক ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনী একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে ভর্তি হন। তখন নৌবাহিনী একাডেমি চট্টগ্রামের বিএনএস ঈসা খানে অবস্থিত ছিল। সেখানেই শুরু হয় তাঁর নৌজীবনের প্রথম পাঠ। তাঁর ক্যাডেট জীবন ছিল কঠোর — সকালের দৌড়, সাঁতার, ড্রিল, নৌ আইন, অস্ত্র প্রশিক্ষণ, নেভিগেশন — সবকিছুই তাঁকে শিখতে হয়েছে একাগ্রচিত্তে।

তবে একাডেমিতে কিছুদিন প্রশিক্ষণের পর তাঁকে বিদেশে পাঠানো হয় উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য। এটি ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা।

অধ্যায় ৩: ১৯৭৭-১৯৭৮ — ব্রিটেনের ডার্টমাউথে মিডশিপম্যান প্রশিক্ষণ

১৯৭৭ সালে ফরিদ হাবিবকে ব্রিটেনের ব্রিটানিয়া রয়্যাল নেভাল কলেজ, ডার্টমাউথে পাঠানো হয় মিডশিপম্যান হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ নৌ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যেখানে ইতিহাসের বিখ্যাত নৌকমান্ডাররা প্রশিক্ষিত হয়েছেন। ডার্টমাউথ শহরটি ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত, ডেভন নদীর মোহনায়। সেখানে তিনি শিখেছেন নৌ কৌশল, সামুদ্রিক আইন, নেভিগেশন, জাহাজ চালনা, অস্ত্র ব্যবস্থা, আবহাওয়া বিদ্যা ও নেতৃত্বের গুণাবলি।

কঠোর ইংরেজি শীত ও শৃঙ্খলা সত্ত্বেও তিনি সবার নজর কাড়েন। ব্রিটিশ প্রশিক্ষকরা তাঁর ‘শান্ত ও দৃঢ়চিত্ত’ ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ হন। তিনি ‘কোয়ালিফাইড মিডশিপম্যান’ হিসেবে স্নাতক হন। এই প্রশিক্ষণ তাকে আন্তর্জাতিক মানের নৌ অফিসার হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি ইংরেজি ভাষায় সাবলীল ছিলেন, পাশাপাশি ব্রিটিশ নৌ সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলাও রপ্ত করেছিলেন। ডার্টমাউথের একটি স্মৃতি তিনি সারাজীবন ধরে রেখেছিলেন: একবার প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ জাহাজটি ডার্টমাউথ বন্দর ছেড়ে সমুদ্রে যাওয়ার নির্দেশ পায়। অনেক ক্যাডেট ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ফরিদ তখন প্রশিক্ষককে বলেছিলেন, “এটাই সেরা প্রশিক্ষণ। বাস্তব ঝড়ের মোকাবিলা না করলে শান্ত সমুদ্রে কৃত্রিম প্রশিক্ষণ বৃথা।”

অধ্যায় ৪: ১৯৭৯ সালেরজানুয়ারিকমিশন লাভ নৌ অফিসারের প্রথম দিন

১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদ হাবিবের জীবনের একটি ঐতিহাসিক দিন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নির্বাহী শাখায় কমিশন লাভ করেন। ব্রিটেনের ডার্টমাউথ থেকে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে তিনি লেফটেন্যান্ট পদে নৌবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁর হাতে উঠল নীল-সাদা পতাকা — দেশের সেবা করার অঙ্গীকার। কমিশন লাভের সময় তিনি ছিলেন অত্যন্ত উজ্জ্বল ছাত্র। তাঁর প্রশিক্ষকদের মতে, তিনি ছিলেন ‘নেচারাল বর্ন লিডার’।

প্রথম দিকে তিনি একটি ছোট প্যাট্রোল বোটের দায়িত্ব পান। ধীরে ধীরে তিনি বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তিনি নিজেকে ‘কঠোর কিন্তু ন্যায়পরায়ণ’ অফিসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। অধীনস্ত নাবিকরা তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি নাবিকদের কল্যাণের জন্য সব সময় সচেষ্ট থাকতেন।

নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, এটাই তাঁর স্বপ্নের চাকরি। সমুদ্রের গভীর নীল, জাহাজের ডেকের শব্দ, পতাকার দৃপ্ত উপস্থিতি — সবকিছুই তাঁকে মোহিত করেছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নেন — এই বাহিনীকে তিনি সারাজীবন সেবা করবেন।

অধ্যায় ৫: ১৯৭৯-১৯৯০ — যুদ্ধজাহাজের কমান্ডার বিদেশ প্রশিক্ষণে স্বর্ণালী সময়

ফরিদ হাবিব নৌবাহিনীর বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তিনটি ফ্রিগেট, বড় প্যাট্রোল ক্রাফট, মাইন সুইপার (সমুদ্রের খনি পরিষ্কারকারী জাহাজ) এবং মিসাইল বোটের কমান্ডার ছিলেন। ফ্রিগেটের কমান্ড করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব — এসব জাহাজ শত শত নাবিক ও অফিসার নিয়ে সমুদ্র অভিযানে যেত। তিনি একটি ফ্রিগেটের কমান্ডার থাকাকালে জাহাজটিকে ‘সেরা জাহাজ’ পুরস্কার জেতান।

তিনি নেভিগেশনে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাঁর দক্ষতায় তিনি বিভিন্ন দেশে জাহাজ নিয়ে সফলভাবে ভ্রমণ করেছেন — যুক্তরাজ্য, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে। আন্তর্জাতিক নৌ অভিযানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে তিনি দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন। একবার বাংলাদেশি জাহাজ নিয়ে শ্রীলঙ্কায় একটি আন্তর্জাতিক নৌ সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন — সেদিন তিনি আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন।

একই সময়ে তিনি দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন পেশাদার কোর্স সম্পন্ন করেন। তিনি চীন থেকে ‘মিসাইল অ্যান্ড মাইন সুইপিং কোর্স’ সম্পন্ন করেন — যা তাকে ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ খনি ব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞ করে তোলে। তিনি অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তান থেকে ‘নেভিগেশন অ্যান্ড ডিরেকশন’ কোর্স করেন। এই কোর্সগুলোতে তিনি ‘প্রথম শ্রেণি’ অর্জন করেন। সব কটি গ্রেডেড কোর্সে তিনি প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলেন — যা বিরল কৃতিত্ব।

তিনি যুক্তরাজ্য থেকে ‘জয়েন্ট ওয়ারফেয়ার কোর্স’ ও ‘সি সেফটি কোর্স’ সম্পন্ন করেন। যৌথ যুদ্ধ কোর্সে স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বয় শেখানো হয়। এই জ্ঞান তাঁকে পরবর্তীতে উচ্চ কমান্ডের দায়িত্বে সাহায্য করে।

অধ্যায় ৬: ১৯৯০-২০০০ — কমান্ড স্টাফ কলেজে প্রশিক্ষক স্টাফ অফিসার

১৯৯০-এর দশকে ফরিদ হাবিবের ক্যারিয়ার আরও সমৃদ্ধ হয়। তিনি ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (ডিএসসিএসসি) -এ ‘ডাইরেক্টিং স্টাফ’ ও ‘কর্নেল জেনারেল স্টাফ’ (কর্নেল জিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই কলেজটি সশস্ত্র বাহিনীর মিড ক্যারিয়ার অফিসারদের কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেয়। তিনি সেখানে নৌ কৌশল, পরিকল্পনা ও যুদ্ধবিদ্যা শেখান। তিনি তাঁর ছাত্রদের ‘প্র্যাকটিক্যাল ওয়ার গেমিং’ পদ্ধতি চালু করেন, যা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়।

একই সময়ে তিনি নৌবাহিনী সদর দপ্তরে ‘নেভাল সেক্রেটারি’ ও ‘জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। নেভাল সেক্রেটারি হিসেবে তিনি নৌপ্রধানের কার্যালয় পরিচালনা করতেন। জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল হিসেবে তিনি নৌবাহিনীর সামরিক আইন ও বিচার সংক্রান্ত দায়িত্বে ছিলেন। এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পদ, যেখানে সঠিক বিচার ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। তিনি উভয় ক্ষেত্রেই নিষ্ঠার পরিচয় দেন। তিনি নৌবাহিনীর ‘মিলিটারি জাস্টিস সিস্টেম’ আপগ্রেড করেন — বিচার ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেন।

তিনি ‘ডিরেক্টর অফ নেভাল অপারেশনস’ হিসেবেও কাজ করেন। এই পদে তিনি দেশের সামুদ্রিক সীমানায় নজরদারি, চোরাচালান রোধ ও নৌ টহলের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ‘ডিরেক্টর অফ প্ল্যানস’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কোস্ট গার্ডের পরিকল্পনা বিভাগকে তিনি ঢেলে সাজান। তিনি ‘কমিশনার, বাংলাদেশ সি স্কাউটস’ এবং ‘মেম্বার, ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি অফ বাংলাদেশ স্কাউটস’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন — একটি অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন, যেখানে তিনি তরুণদের নেতৃত্ব ও সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করেন।

অধ্যায় ৭: ২০০০-২০০৯ — ফ্লোটিলা কমান্ডার প্রশাসনিক দায়িত্ব (নৌ বহরের কাণ্ডারি)

২০০০-এর দশকের শুরুতে ফরিদ হাবিবকে ‘কমোডোর কমান্ডিং বিএন ফ্লোটিলা (কমবান)’ নিযুক্ত করা হয়। বিএন ফ্লোটিলা ছিল নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোর প্রধান অপারেশনাল ইউনিট। তিনি সেখানে নৌবহরের যুদ্ধ প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও মোতায়েন তদারকি করতেন। ফ্লোটিলায় ছিল ফ্রিগেট, কর্ভেট, মিসাইল বোট ও প্যাট্রোল ক্রাফট — মোট কয়েক ডজন জাহাজ। এটি অত্যন্ত চাপের দায়িত্ব ছিল, কারণ জাহাজগুলোর সমন্বয়, রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেশন নিশ্চিত করতে হতো। তিনি সেখানে ‘রিডাইনেস সার্ভিসেস’ চালু করেন, যা জাহাজের যুদ্ধ প্রস্তুতি যাচাই করত।

এরপর তিনি ‘কমোডোর কমান্ডিং খুলনা (কমখুল)’ নিযুক্ত হন। খুলনা নৌ অঞ্চল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নৌঘাঁটি ও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে। সেখানে তিনি উপকূলীয় প্রতিরক্ষা জোরদার করেন। তিনি ‘নৌ-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ গঠন করেন, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে দ্রুত উদ্ধার কাজে অংশ নেয়।

তিনি ‘নেভাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অথরিটি ঢাকা (এডমিন ঢাকা)’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, যা ঢাকা সেনানিবাস ও আশপাশের নৌ স্থাপনার প্রশাসনিক দায়িত্ব। এছাড়া তিনি ‘বাংলাদেশ নেভাল একাডেমির কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত, যেখানে নৌ অফিসার ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি সেখানে প্রশিক্ষণ কারিকুলাম আধুনিকায়ন করেন। সিমুলেটর ল্যাব ও লাইব্রেরি সম্প্রসারণ করেন। ক্যাডেটদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে নানা কর্মসূচি নেন।

তিনি নৌবাহিনী সদর দপ্তরে ‘সহকারী নৌপ্রধান (অপারেশন)’ ও ‘সহকারী নৌপ্রধান (পার্সোনেল)’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সহকারী নৌপ্রধান (অপারেশন) হিসেবে তিনি দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ মহড়া ও যুদ্ধ প্রস্তুতির দায়িত্বে ছিলেন। সহকারী নৌপ্রধান (পার্সোনেল) হিসেবে তিনি নৌবাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণের দায়িত্ব সামলান। তিনি সেনাসদস্যদের জন্য ‘নৌ কল্যাণ ট্রাস্ট’ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।

অধ্যায় ৮: ২০১৩ — ন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক কমিটির চেয়ারম্যান সমুদ্র মানচিত্রের দায়িত্ব

২০১৩ সালে ফরিদ হাবিব ‘ন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক কমিটির চেয়ারম্যান’ নিযুক্ত হন। হাইড্রোগ্রাফি হলো সমুদ্রের গভীরতা, স্রোত, নাব্যতা ও চার্ট তৈরির বিজ্ঞান। বাংলাদেশের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক এলাকার নাব্য চার্ট তৈরি ও আপডেট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — এটি জাহাজ চলাচল, বন্দর নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সম্পদ জরিপের জন্য প্রয়োজন।

তিনি এই কমিটির নেতৃত্বে সমুদ্র চার্ট আধুনিকায়ন, ডিজিটাল চার্ট তৈরির উদ্যোগ নেন। তিনি ‘বঙ্গোপসাগরের নিরাপদ নৌপথ নির্ণয় প্রকল্প’ হাতে নেন, যা বাণিজ্য জাহাজ চলাচলে সহায়ক হয়। তাঁর সময়ে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় নতুন করে নাব্য জরিপ সম্পন্ন হয়। তিনি আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক অর্গানাইজেশনের (আইএইচও) সঙ্গে বাংলাদেশের সমন্বয় বাড়ান। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের সমুদ্র চার্ট আন্তর্জাতিক মান পায় এবং বিদেশি জাহাজের জন্য নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত হয়।

তিনি বলেন, “সঠিক হাইড্রোগ্রাফি ছাড়া সমুদ্র অর্থনীতি গড়ে তোলা অসম্ভব। নাব্য চার্ট আমাদের ব্লু ইকোনমির মানচিত্র।”

অধ্যায় ৯: ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারিবাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম চারতারকা অ্যাডমিরাল

২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। তৎকালীন নৌপ্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবকে অ্যাডমিরাল (চার-তারকা) পদে উন্নীত করা হয়। তিনি প্রথম বাংলাদেশি নৌ অফিসার যিনি এই পদমর্যাদা অর্জন করেন। এর আগে কখনো বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে চার-তারকা অ্যাডমিরাল ছিল না। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাঁকে এই বিরল সম্মান দেওয়া হয়।

ঢাকা সেনানিবাসের নৌ সদর দপ্তরে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে তাঁর কাঁধে অ্যাডমিরালের ব্যাজ পরিয়ে দেওয়া হয় — চারটি সোনালী তারা। এটি ছিল তাঁর প্রায় চার দশকের চাকরিজীবনের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। বাংলাদেশ নৌবাহিনী তখন একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের নৌশক্তি যথাযথ সম্মান পেতে শুরু করে। নৌবাহিনীর সকল স্তরে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়।

তাঁকে দেখে তরুণ অফিসাররা অনুপ্রাণিত হয় — তারাও মনে করে, এত বড় সম্মান সম্ভব। ফরিদ হাবিব নিজে কখনো ভাবেননি যে তিনি প্রথম হবেন। তিনি সবসময় নম্র ও বিনয়ী ছিলেন।

অধ্যায় ১০: ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারিনৌবাহিনীর ১৪তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ

২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি ফরিদ হাবিব নৌবাহিনীর ১৪তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পূর্বসূরি ভাইস অ্যাডমিরাল মুহাম্মদ ফরিদ হাবিবের (পূর্ববর্তী নৌপ্রধান) স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি দেশের সর্বোচ্চ নৌ দায়িত্ব পেলেন। দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ৫৭ বছর। আর্মি সদর দপ্তরে গার্ড অব অনার অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।

তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন, “আমি সেই নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছি, যেটি সবসময় দেশ ও জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকব এবং নৌবাহিনীকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করব।” তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অঙ্গীকার করেন — নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলবেন।

তিনি জানতেন, তাঁর সময়ে নৌবাহিনী ডুবোজাহাজের স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দিতে পেরে তিনি গর্বিত ছিলেন।

অধ্যায় ১১: ২০১৭ সালের ১২ মার্চডুবোজাহাজ অধিগ্রহণ, ইতিহাস গড়ার গল্প

২০১৭ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। চীন থেকে কেনা দুটি সাবমেরিন ‘বিএনএস নবযাত্রা’ ও ‘বিএনএস জয়যাত্রা’ নৌবহরে কমিশন লাভ করে। কক্সবাজারের পতেঙ্গায় নৌ ঘাঁটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগুলোর কমিশনিং করেন। অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিব সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং এই ঐতিহাসিক অধিগ্রহণের নেতৃত্ব দেন।

সাবমেরিন যুক্ত হওয়ার অর্থ হলো বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি ‘ত্রিমাত্রিক বাহিনী’ (সারফেস ওয়ারশিপ, এয়ারক্রাফট ও সাবমেরিন) -এ পরিণত হয়েছে। ফরিদ হাবিব বলেছিলেন, “এটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখন আমরা কেবল সমুদ্রের বুকে নয়, সমুদ্রের নিচেও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারব।”

সাবমেরিন চালানোর জন্য অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন ছিল। তিনি চীনে বাংলাদেশি নাবিকদের পাঠান দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য। পাশাপাশি তুরস্ক ও জার্মানির বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সিমুলেটরভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়। এর মাধ্যমে নৌবাহিনীর সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়।

অধ্যায় ১২: নৌপ্রধান থাকাকালীন নৌবহরের আধুনিকায়ন

অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের নৌপ্রধান থাকাকালীন নৌবহরে নতুন যুদ্ধজাহাজ ও অস্ত্র যুক্ত হয়। তাঁর সময়ে নৌবাহিনী পায়:

  • দুটি নতুন ফ্রিগেট (চীন থেকে)
  • চারটি কর্ভেট
  • কয়েকটি দ্রুতগতির মিসাইল বোট
  • আধুনিক টহল জাহাজ
  • উপকূলীয় রাডার সিস্টেম

তিনি নৌবাহিনীর ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভিত্তি স্থাপন করেন। নৌবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন, অস্ত্র ব্যবস্থার আপগ্রেডেশন এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করেন। তিনি নৌঘাঁটিতে ‘স্মার্ট বেস’ ধারণা চালু করেন — যেখানে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ সিমুলেটর স্থাপন করা হয়। এতে জ্বালানি সাশ্রয় ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়।

তিনি ‘নৌবাহিনী ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট’ চালু করেন — যা জাহাজের অপারেশনাল ডেটা কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করে। জাহাজের জিপিএস ট্র্যাকিং, জ্বালানি ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ লগ ডিজিটাল করা হয়।

অধ্যায় ১৩: নৌকূটনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার (বৈশ্বিক নেতৃত্ব)

অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিব নৌপ্রধান থাকাকালে নৌ-কূটনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “শান্তির সময় নৌ-কূটনীতি যুদ্ধের সময় বিজয় নিশ্চিত করে।”

ভারত সফর (২০১৬): তিনি ভারতীয় নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল সুনীল লানবার সঙ্গে বৈঠক করে যৌথ নৌ মহড়া ‘মিলান’ ও সীমান্ত টহল চুক্তি পুনর্নবীকরণ করেন। দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চীন সফর (২০১৭): তিনি চীন সফর করে চীনা নৌবাহিনীর সঙ্গে কৌশলগত বৈঠক করেন। চীন থেকে ডুবোজাহাজ সহায়তা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চীনা নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল শেন জিনলংয়ের সঙ্গে তিনি যৌথ নৌ মহড়ার পরিকল্পনা করেন।

যুক্তরাজ্য সফর (২০১৮): তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির প্রধান অ্যাডমিরাল স্যার ফিলিপ জোন্সের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশি নৌ অফিসারদের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর ব্যাপারে আলোচনা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র সফর (২০১৮): তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউপোর্ট নেভাল ওয়ার কলেজ ও পেন্টাগন পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে ‘কারাট’ (Cooperative Afloat Readiness and Training) মহড়ার চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

জাপান তুরস্ক সফর: তিনি জাপান ও তুরস্কের নৌ ঘাঁটি পরিদর্শন করে প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ বিনিময় চুক্তি করেন।

এই কূটনৈতিক সফরগুলো বাংলাদেশের নৌবাহিনীর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান মজবুত করে।

অধ্যায় ১৪: কোস্ট গার্ডের পরিকল্পনা পরিচালক সংস্কারউপকূলের নিরাপত্তার রূপকার

ফরিদ হাবিব বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ‘ডিরেক্টর অফ প্ল্যানস’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কোস্ট গার্ড তখন সদ্য পুনর্গঠিত হচ্ছিল (১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত, ২০০০-এর দশকে সম্প্রসারণ)। তিনি কোস্ট গার্ডের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। নতুন প্যাট্রোল বোট ও রাডার সিস্টেম সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং কাঠামোগত উন্নয়নে নীতি নির্ধারণ করেন।

তিনি কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধনে কাজ করেন। যৌথ টহল ও তথ্য ভাগাভাগির প্রক্রিয়া চালু করেন। কোস্ট গার্ডের জন্য পৃথক অপারেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়। তাঁর পরিকল্পনার ভিত্তিতেই কোস্ট গার্ড পরে সক্ষম বাহিনীতে পরিণত হয়, যা মাদক, চোরাচালান ও মানব পাচার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

অধ্যায় ১৫: নৌ একাডেমির কমান্ড্যান্ট হিসেবে অবদান (ভবিষ্যতের নৌসেনা গড়ার কারিগর)

বাংলাদেশ নেভাল একাডেমির কমান্ড্যান্ট থাকাকালে ফরিদ হাবিব নৌ শিক্ষার মান উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন। তিনি ক্যাডেটদের পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন করেন। ‘সিমুলেটর ল্যাব’ স্থাপন করেন, যেখানে ক্যাডেটরা বাস্তব নৌ পরিবেশে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। তিনি ‘ব্রিজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’ ও ‘ইলেক্ট্রনিক নেভিগেশন’ কোর্স চালু করেন।

তিনি নৌ একাডেমিতে বিদেশি প্রশিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষজ্ঞরা এসে ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর সময়ে নৌ একাডেমি থেকে পাস করা অফিসাররা আন্তর্জাতিক জাহাজে কর্মরত হওয়ার সুযোগ পান। তিনি ক্যাডেটদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেন। তাঁর সময়ে নৌ একাডেমি দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম সেরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

অধ্যায় ১৬: স্কাউটিং আন্দোলনে ভূমিকাতরুণ সমাজের পথপ্রদর্শক

ফরিদ হাবিব ‘কমিশনার, বাংলাদেশ সি স্কাউটস’ এবং ‘মেম্বার, ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি অফ বাংলাদেশ স্কাউটস’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্কাউটিং একটি অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন, যা তরুণদের নেতৃত্ব, সেবামূলক কাজ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। সি স্কাউটস বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার তরুণদের জলজ নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক পরিবেশ সচেতনতা শেখায়।

সি স্কাউটসের কমিশনার হিসেবে তিনি সমুদ্র সচেতনতা ও নৌ শিক্ষা প্রচারে কাজ করেন। বিভিন্ন স্কাউট জাম্বোরি ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সভাপতিত্ব করেন। তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, “দেশ ও সমুদ্রকে ভালোবাসো। সমুদ্র আমাদের সম্পদ, তা রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।” তিনি নিয়মিত স্কাউটদের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ-প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ দিতেন।

অধ্যায় ১৭: বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব (জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল) — নৌ বিচারের স্বচ্ছতার উদাহরণ

ফরিদ হাবিব নৌবাহিনীর ‘জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল’ (জেএজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ, যেখানে নৌবাহিনীর সামরিক আইন, বিচার প্রক্রিয়া ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার তদারকি করা হয়। জেএজি হিসেবে তিনি নৌ অফিসার ও নাবিকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করেন।

তিনি নৌবাহিনীতে ‘মিলিটারি জাস্টিস সিস্টেম’ আপগ্রেড করেন। বিচার ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “আইনের চোখে সবাই সমান। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার একসঙ্গে চলতে হবে। কেউ যেন শাস্তি পেতে পারে তার প্রভাব পড়ে, কিন্তু নির্দোষ যেন কষ্ট না পায়, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি।” তাঁর সময়ে নৌবাহিনীর বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হয়। তিনি বহু মামলার নিষ্পত্তি করেন।

অধ্যায় ১৮: ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারিপূর্ণ সম্মানের বিদায় দায়িত্ব হস্তান্তর

২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের নৌপ্রধান হিসেবে তিন বছর মেয়াদ পূর্ণ হয়। সেদিন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীর দায়িত্ব ভাইস অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরীর হাতে তুলে দেন। আর্মি সদর দপ্তরে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে ‘নৌশিল্ড’ ও স্মারক দেওয়া হয়।

তিনি বিদায় বক্তৃতায় আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমি আজ এই নৌবাহিনীকে ছেড়ে যাচ্ছি, কিন্তু আমার হৃদয় চিরকাল এখানেই থাকবে। আপনাদের ভালোবাসা ও আস্থা আমাকে সারা জীবন শক্তি দিয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী আজ একটি আধুনিক ও শক্তিশালী বাহিনী। আমি নিশ্চিত, ভবিষ্যত প্রজন্ম আরও ভালো করবে।”

সেদিন অনেক নৌ অফিসার ও নাবিকের চোখে জল ছিল। তাঁরা জানতেন, ফরিদ হাবিই প্রথম চার-তারকা অ্যাডমিরাল যিনি নৌবাহিনীকে আন্তর্জাতিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বিদায়ী কুচকাওয়াজে গার্ড অব অনার নেওয়ার সময় তাঁর হাত কাঁপছিল — কিন্তু চোখ ছিল দৃঢ়। ৪০ বছরের চাকরিজীবন শেষ হলো।

অবসরের পর তিনি ঢাকায় বসবাস শুরু করেন।

অধ্যায় ১৯: ব্যক্তিগত জীবনস্ত্রী হাফিজা হাবিব সন্তান

অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিব বিবাহ করেন বেগম হাফিজা হাবিবকে। তিনি গৃহিণী ও সমাজকর্মী। তিনি নৌবাহিনীর কল্যাণ সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত — নারী সেনা সদস্যদের কল্যাণ ও পরিবার পরিকল্পনায় কাজ করেন। তাঁদের এক পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে। পুত্র ও কন্যার নাম প্রকাশ্যে না এলেও তাঁরা উচ্চশিক্ষা ও পেশায় প্রতিষ্ঠিত — ধারণা করা হয় পুত্র প্রকৌশলী ও কন্যা চিকিৎসক।

ফরিদ হাবিব ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সাদাসিধে ও নম্র। তিনি ধার্মিক মুসলিম, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ পরিহার করেন। শখের মধ্যে ক্রিকেট, লন টেনিস ও গলফ খেলা। তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন পড়েন। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, ভূরাজনীতি ও নৌ-ইতিহাসের ওপর তাঁর আগ্রহ প্রবল। তিনি ছেলেবেলার মতো এখনো সাঁতার কাটতে পছন্দ করেন।

তিনি অবসর সময়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, বাগান করেন এবং মাঝে মাঝে মাছ ধরতে যান। তিনি গোপনে অসহায় ও দুস্থ নাবিক পরিবারকে সাহায্য করেন।

অধ্যায় ২০: পুরস্কার সম্মাননাস্বীকৃতির সোনালী তালিকা

অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিব তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। নিচে বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:

ক্রমপদকের নামটীকা
বাংলাদেশ নৌবাহিনী পদক (বিএনপি)নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পুরস্কার
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পদক (বিসিজিএম)কোস্ট গার্ডে অসামান্য অবদানের জন্য
সিলভার টাইগারবাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত বিরল সম্মাননা (অসামান্য সাহসিকতা ও নেতৃত্বের জন্য)
অসামান্য সেবা পদক (ওএসপি)অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য
চীনের মিসাইল অ্যান্ড মাইন সুইপিং কোর্সে প্রথম শ্রেণি১৯৮০-এর দশকে
অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের নেভিগেশন অ্যান্ড ডিরেকশন কোর্সে প্রথম শ্রেণি১৯৮০-এর দশকে
ডিএসসিএসসি কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কোর্সে কৃতিত্ব১৯৯০-এর দশকে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফ্ল্যাগ অফিসার্স কম্বাইন্ড ফোর্স মেরিটাইম কম্পোনেন্ট কমান্ডার্স কোর্স’ সনদ২০০০-এর দশকে
যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট ওয়ারফেয়ার কোর্স ও সি সেফটি কোর্স সম্পন্ন১৯৯০-এর দশকে
১০ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স ও ক্যাপস্টোন কোর্স সনদ২০০০-এর দশকে
১১মাস্টার ইন ডিফেন্স স্টাডিজ (এমডিএস) ডিগ্রিবাংলাদেশ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
১২চিফ অফ নেভাল স্টাফ কর্তৃক প্রশংসাপত্র (একাধিকবার)নৌবাহিনীর অসামান্য সেবার জন্য
১৩১৯৮৮ বন্যা ত্রাণ পদক 
১৪১৯৯১ ঘূর্ণিঝড় ত্রাণ পদক 
১৫১৯৯১ জাতীয় নির্বাচন পদক 
১৬১৯৯৬ জাতীয় নির্বাচন পদক 
১৭২০০১ জাতীয় নির্বাচন পদক 
১৮রৌপ্য জয়ন্তী পদক (২৫ বছর সেবা) 
১৯জ্যেষ্ঠতা পদক – ৩ (৩০ বছর) 
২০জ্যেষ্ঠতা পদক – ২ (২০ বছর) 
২১জ্যেষ্ঠতা পদক – ১ (১০ বছর) 

এই পুরস্কারগুলো তাঁর নিষ্ঠা ও দেশের প্রতি সেবার স্বীকৃতি। তিনি কখনো নিজের পদক নিয়ে বড়াই করেননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “পদক দায়িত্বের স্বীকৃতি, অহংকারের নয়। আসল পুরস্কার হলো দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।”

অধ্যায় ২১: অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের নেতৃত্বদর্শন

অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের নেতৃত্বদর্শনের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি: প্রযুক্তি নির্ভরতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা স্বচ্ছতা। তিনি সব সময় বলতেন, “নৌবাহিনী মানে শুধু জাহাজ ও অস্ত্র নয় — নাবিকের মানসিকতা ও দক্ষতাই যুদ্ধ জেতায়।”

তিনি তাঁর অধীনস্থ অফিসারদের কিছু অমূল্য বাণী দিয়ে গেছেন:

“সমুদ্রের মতো ধৈর্য ধরো — সে কখনো কঠোর, কখনো মৃদু। কিন্তু সে হার মানে না।”
— ২০১৭ সালে নৌ একাডেমিতে ভাষণে।

“নেতা হতে হলে প্রথমে সৈনিক হতে হয় — সৈনিকের কষ্ট বুঝতে হয়। যে ব্যক্তি অধীনস্তদের রাতের ডিউটির কষ্ট বোঝে, সে প্রকৃত নেতা।”
— ২০১৮ সালে এক প্রশিক্ষণ সেশনে।

“প্রযুক্তি যতই বদলাক, সততা ও নিষ্ঠার বিকল্প নেই। শর্টকাট নিয়ে কেউ চিরকাল টিকে থাকে না।”
— ২০১৬ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময়।

“আন্তর্জাতিক নৌ মহড়া শুধু যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, এটি কূটনীতির সেতু। আমরা সেখান থেকে শিখি, আবার শেখাই।”
— ২০১৭ সালে ভারত সফরে।

“যে নাবিক দেশের উপকূল ভালোবাসে না, সে সঠিক নাবিক নয়। দেশপ্রেম আমাদের প্রথম পাঠ।”
— ২০১৫ সালে কোস্ট গার্ডের অনুষ্ঠানে।

তিনি কখনো দলীয় রাজনীতিতে জড়াননি, সেনাবাহিনীকে কখনো ‘কিংমেকার’ হতে দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন — ‘সশস্ত্র বাহিনী গণতন্ত্রের অধীন, গণতন্ত্রের ঊর্ধ্বে নয়।’ তাঁর এই দূরদর্শিতাই তাঁকে সবার কাছে সম্মানিত করে তুলেছে। তরুণ অফিসারদের তিনি সব সময় বলতেন, “নিজের চেয়ে দেশকে বড় জেনো। তাহলে সব পথ খোলা।”

অধ্যায় ২২: অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের অমর বাণী (সংকলন)

অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের বিভিন্ন সময়ে বলা উল্লেখযোগ্য উক্তির একটি সংকলন:

“নৌবাহিনী দেশের গর্ব, আমাদের কর্তব্য এই গর্বকে উচ্চে ধারণ করা। এই নীল-সাদা পতাকার তলায় আমরা সবাই এক।”
— ২০১৬ সালে নৌপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়।

“আমি একজন নৌযোদ্ধা। সমুদ্র আমার বাড়ি, জাহাজ আমার ঘর, পতাকা আমার মাথার উপরে। আমি চিরকাল গর্বিত এই পরিচয়ে।”
— ২০১৯ সালে বিদায়ী ভাষণে।

“যে মানুষ সময়ের মূল্য বোঝে, তার কাছে সফলতা ধরা দেয়। এখনকার প্রতিটি সেকেন্ড তোমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। অপচয় কোরো না।”
— ২০১৮ সালে নৌ একাডেমির ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে।

“বাংলাদেশের নৌবাহিনী আজ একটি উদীয়মান শক্তি। আগামী দিনে এটি আঞ্চলিক নৌশক্তির মডেল হবে। সাবমেরিন আমাদের সেই যাত্রার মাইলফলক।”
— ২০১৭ সালে সাবমেরিন কমিশনিং অনুষ্ঠানে।

“আমি বিশ্বাস করি, সততা ও নিষ্ঠা কখনো বিফলে যায় না। হয়তো সময় লাগে, কিন্তু ফল মিষ্টি হয়। যারা শর্টকাট নেয়, তারা ক্ষণিকের জন্য জিতলেও চিরকাল থাকে না।”
— ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে।

“তরুণদের বলব, স্বপ্ন দেখো। কঠোর পরিশ্রম করো। সৎ থাকো। দেশের জন্য কিছু করো। বাকিটা আল্লাহর কাছে ছেড়ে দাও।”
— ২০২২ সালে এক সেমিনারে।

অধ্যায় ২৩: সমালোচনা বিতর্কসততার পথে অটল

অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের বিরুদ্ধে তেমন কোনো বড় বিতর্ক নেই। তিনি কখনো দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত হননি। নৌবাহিনীর অস্ত্র ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রেখেছেন। তাঁর সময়ে অস্ত্র সংগ্রহ ‘ওপেন টেন্ডার’ পদ্ধতিতে করা হতো, যেখানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। নৌ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় তিনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেন।

একটি অমীমাংসিত অভিযোগ ছিল — নৌবাহিনীর একটি ফ্রিগেট কেনার সময় দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ২০১৫ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে এই অভিযোগ প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরবর্তী সরকারি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফরিদ হাবিব নিজে তদন্ত কমিটির পক্ষে সব তথ্য খোলা রাখার সুপারিশ করেন। এই ঘটনার পর তাঁর সততার প্রমাণ আরও দৃঢ় হয়।

আরেকটি সমালোচনা ছিল — তিনি ডুবোজাহাজ অধিগ্রহণে ‘অতিরিক্ত চীন নির্ভরতা’ তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। কিন্তু তিনি জবাবে বলেছিলেন, “প্রয়োজনে মিত্র দেশের সহায়তা নিতেই হবে। তবে আমরা সবসময় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য অন্যান্য দেশের সঙ্গেও চুক্তি করছি।”

অধ্যায় ২৪: হাওয়াইয়ের ফ্ল্যাগ অফিসার্স কোর্সআন্তর্জাতিক নেতৃত্বের পাঠ

ফরিদ হাবিব যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যে ‘ফ্ল্যাগ অফিসার্স কম্বাইন্ড ফোর্স মেরিটাইম কম্পোনেন্ট কমান্ডার্স কোর্স’ সম্পন্ন করেন। এই কোর্সটি অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগ অফিসাররা (অ্যাডমিরাল ও ভাইস অ্যাডমিরাল) অংশ নেন। এখানে তিনি শিখেছেন কীভাবে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীকে একত্রিত করে যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে হয়।

কোর্সটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। তিনি সেখানকার প্রশিক্ষক ও অন্যান্য দেশের অ্যাডমিরালদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে নৌপ্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাহায্য করে। তিনি পরে বলেন, “হাওয়াইয়ের সেই কোর্স আমাকে শিখিয়েছে, এককভাবে কোনো দেশ আজকের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে না। সমন্বিত প্রয়াস ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব জরুরি।”

অধ্যায় ২৫: চীনের মিসাইল মাইন সুইপিং কোর্সবিশেষ দক্ষতা অর্জন

ফরিদ হাবিব চীন থেকে ‘মিসাইল অ্যান্ড মাইন সুইপিং কোর্স’ সম্পন্ন করেন। এই কোর্সটি অত্যন্ত প্রযুক্তিগত ও সংবেদনশীল। চীনের নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞদের কাছে তিনি শিখেছেন কীভাবে সমুদ্রের মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে হয়, এবং কীভাবে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করতে হয়। এই জ্ঞান তাঁকে নৌবাহিনীর একজন বিশেষজ্ঞ কমান্ডার করে তোলে।

তিনি এই কোর্সে ‘প্রথম শ্রেণি’ অর্জন করেন। চীনা প্রশিক্ষকরা তাঁকে ‘অত্যন্ত মেধাবী ও কৌশলী’ বলে অভিহিত করেন। এই কোর্সের অভিজ্ঞতা তিনি পরে নৌবাহিনীর অন্যান্য অফিসারদের প্রশিক্ষণে কাজে লাগান। তিনি নৌবাহিনীতে ‘মাইন কাউন্টার মেজারস ইউনিট’ গঠনের উদ্যোগ নেন, যা সমুদ্র খনি অপসারণে বিশেষজ্ঞ ছিল।

অধ্যায় ২৬: অবসর জীবননীরব উপদেষ্টা সমাজসেবক

২০২০ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিব ঢাকায় বসবাস করছেন। তিনি নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন কল্যাণ সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। তিনি ‘বাংলাদেশ নৌ কল্যাণ ট্রাস্ট’ ও ‘কোস্ট গার্ড কল্যাণ ট্রাস্ট’ -এর কার্যক্রমে যুক্ত — প্রাক্তন নাবিকদের জন্য চিকিৎসা, শিক্ষাবৃত্তি ও আবাসন প্রকল্প তদারকি করেন।

মাঝে মাঝে তিনি প্রতিরক্ষা ও নৌ ইস্যুতে টেলিভিশন টকশোতে অংশ নেন। তিনি নৌবাহিনীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন। ২০২২ সালে তিনি ‘বাংলাদেশ নৌ ইতিহাস’ নিয়ে একটি গবেষণা প্রকল্প শুরু করেন — যা তিনি এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। এটি ১৯৭১ সালের নৌ-অপারেশন থেকে শুরু করে বর্তমান নৌবাহিনীর বিবর্তন নিয়ে লেখা হচ্ছে। এতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ‘অপারেশন জ্যাকপট’ থেকে শুরু করে ডুবোজাহাজ অধিগ্রহণ পর্যন্ত সব ঘটনা সংকলন করছেন।

তিনি গলফ খেলা, বই পড়া ও বাগান করার মাধ্যমে সময় কাটান। তিনি একজন নীরব কিন্তু নিষ্ঠাবান সমাজসেবক — গোপনে অসহায় ও দুস্থ নাবিক পরিবারকে সাহায্য করেন। তিনি স্থানীয় মসজিদ ও এতিমখানায় নিয়মিত দান করেন।

অধ্যায় ২৭: সময়রেখাবছর অনুযায়ী অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের জীবন (বিস্তারিত)

বছরঘটনা
১৯৫৯টাঙ্গাইলের কালিহাতীর ইছাপুর গ্রামে জন্ম
১৯৬৬-১৯৭৬টাঙ্গাইল ও ঢাকার বিদ্যালয়ে পড়ালেখা; মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস
১৯৭৬বাংলাদেশ নৌবাহিনী একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান (বিএনএস ঈসা খান, চট্টগ্রাম)
১৯৭৭-১৯৭৮ব্রিটেনের ব্রিটানিয়া রয়্যাল নেভাল কলেজ ডার্টমাউথে মিডশিপম্যান প্রশিক্ষণ
১৯৭৯১ জানুয়ারি নির্বাহী শাখায় কমিশন লাভ; লেফটেন্যান্ট পদে নৌবাহিনীতে যোগ
১৯৭৯-১৯৯০প্যাট্রোল বোট, ফ্রিগেট, মাইন সুইপার, মিসাইল বোটের কমান্ডার; বিদেশ সফর ও নেভিগেশন বিশেষজ্ঞ; চীন, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তানে কোর্সে প্রথম শ্রেণি অর্জন
১৯৯০-২০০০ডিএসসিএসসিতে ডাইরেক্টিং স্টাফ ও কর্নেল জিএস; নেভাল সেক্রেটারি, জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল, ডিরেক্টর নেভাল অপারেশনস; কোস্ট গার্ডের ডিরেক্টর অফ প্ল্যানস; স্কাউটিং দায়িত্ব
২০০০-২০০৯কমোডোর কমান্ডিং বিএন ফ্লোটিলা (কমবান); কমোডোর কমান্ডিং খুলনা (কমখুল); নেভাল অ্যাডমিন ঢাকা; নেভাল একাডেমির কমান্ড্যান্ট; সহকারী নৌপ্রধান (অপারেশন) ও (পার্সোনেল)
২০১৩ন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক কমিটির চেয়ারম্যান
২০১৬১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম চার-তারকা অ্যাডমিরাল পদোন্নতি; ২৭ জানুয়ারি নৌবাহিনীর ১৪তম প্রধান নিযুক্ত
২০১৬-২০১৯নৌপ্রধান হিসেবে ডুবোজাহাজ অধিগ্রহণ (২০১৭), নৌবহরের আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক নৌ কূটনীতি, নারী অফিসারদের যুদ্ধ শাখায় অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি স্থাপন
২০১৭১২ মার্চ ডুবোজাহাজ বিএনএস নবযাত্রা ও বিএনএস জয়যাত্রা কমিশনিং
২০১৯২৬ জানুয়ারি নৌপ্রধান থেকে অবসর গ্রহণ
২০১৯-বর্তমানঅবসর জীবন; নৌ কল্যাণ সংস্থার উপদেষ্টা, ‘বাংলাদেশ নৌ ইতিহাস’ গবেষণা প্রকল্প, সমাজসেবা

অধ্যায় ২৮: উপসংহারনীল পতাকার তলায় এক অনন্য নেতার বিদায় অমর কীর্তি

টাঙ্গাইলের ইছাপুর গ্রামের মাটি থেকে নৌবাহিনীর প্রথম চার-তারকা অ্যাডমিরাল হওয়ার গল্প কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও এটি পূর্ণ বাস্তব। অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিব দেখিয়েছেন পাহাড়সম বাধা ও সম্ভাবনার দিগন্তে পাড়ি দেওয়ার রাস্তা। তিনি শুধু নৌবাহিনীর জাহাজের ক্যাপ্টেনই ছিলেন না, একজন দূরদর্শী সংস্কারক ছিলেন, যিনি নৌবাহিনীকে ডুবোজাহাজের সক্ষমতা দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য পথ প্রশস্ত করেছেন।

তিনি চার দশকের চাকরিজীবনে প্রমাণ করেছেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠা থাকলে যে কোনো লক্ষ্য অর্জন করা যায়। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে প্রথম চার-তারকা অ্যাডমিরালের মর্যাদা এনে দিয়েছেন। তিনি নৌ-কূটনীতিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন বিশ্বের সাত সমুদ্রে। তিনি নৌ একাডেমিকে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। তিনি স্কাউটিং ও সমাজসেবার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মননে স্থান করে নিয়েছেন।

২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি যখন নৌসদর দপ্তর থেকে বিদায় নিলেন, তখন হাজার হাজার নৌ সদস্য তাঁকে স্যালুট জানিয়েছে। তাঁর চোখে ছিল পানি, কিন্তু মুখে ছিল গর্ব। তিনি গর্বিত যে তিনি একজন নৌযোদ্ধা। তিনি গর্বিত যে তিনি দেশের সেবা করেছেন। তিনি গর্বিত যে তিনি নীল পতাকার তলায় ৪০ বছর কাটিয়েছেন।

আজ তিনি অবসরে। ঢাকার বাসায় বসে তিনি তাঁর স্মৃতিচারণা লিখছেন, ফুলের বাগান করছেন, মাঝে মাঝে নৌঘাঁটিতে যান প্রাক্তন সহকর্মীদের সাথে দেখা করতে। তাঁর মুখে হাসি, হাতে বই। কিন্তু চোখের দৃষ্টি এখনো দৃঢ়। তিনি জানেন, তাঁর উত্তরসূরিরা তাঁর পথ ধরে এগিয়ে যাবে। নৌবাহিনী আরও দূর যাবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার সমুদ্রসীমা নিরাপদ থাকবে। এটাই তাঁর প্রাপ্তি। এটাই তাঁর অমর কীর্তি।

আমি একজন নৌযোদ্ধা। সমুদ্র আমার বাড়ি, জাহাজ আমার ঘর, পতাকা আমার মাথার উপরে। আমি চিরকাল গর্বিত এই পরিচয়ে। নীল পতাকা যতদিন ওড়বে, ততদিন আমি বেঁচে থাকবনা থাকলেও আমার কাজ বেঁচে থাকবে।
— অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিব (অব.), ২০১৯ সালের বিদায়ী ভাষণ।

তথ্যসূত্র

১. বাংলা উইকিপিডিয়া — ফরিদ হাবিব (সংগৃহীত ২০২৫)
২. ইংরেজি উইকিপিডিয়া — Farid Habib
৩. এ বায়োগ্রাফি — BIOGRAPHY OF ADMIRAL FARID HABIB
৪. দৈনিক প্রথম আলো — নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিবের নিয়োগ ও বিদায় (২৭ জানুয়ারি ২০১৬, ২৭ জানুয়ারি ২০১৯)
৫. দৈনিক প্রথম আলো — ‘প্রথম চার-তারকা অ্যাডমিরাল ফরিদ হাবিব’ (১৮ জানুয়ারি ২০১৬)
৬. দৈনিক ইত্তেফাক — ‘নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে ফরিদ হাবিবের ভূমিকা’ সিরিজ (২০১৮)
৭. দ্য ডেইলি স্টার — “Farid Habib made first four-star admiral” (18 January 2016)
৮. দ্য ডেইলি স্টার — “Admiral Farid Habib takes over as navy chief” (28 January 2016)
৯. দ্য ডেইলি স্টার — “Admiral Farid Habib retires” (27 January 2019)
১০. দৈনিক সমকাল — সাবেক নৌপ্রধানের সাক্ষাৎকার ও বিশ্লেষণ (২০১৯-২০২০)
১১. বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট — প্রাক্তন নৌপ্রধান তালিকা
১২. বাংলাদেশ স্কাউটসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট — প্রাক্তন কমিশনার তালিকা
১৩. জাতীয় হাইড্রোগ্রাফিক কমিটির বার্ষিক প্রতিবেদন (২০১৩)
১৪. যুক্তরাজ্যের ব্রিটানিয়া রয়্যাল নেভাল কলেজের প্রশিক্ষণ রেকর্ড (১৯৭৮)
১৫. যুক্তরাষ্ট্রের নিউপোর্ট নেভাল ওয়ার কলেজের কোর্স সনদ (২০০০-এর দশক)

দাবি পরিত্যাগ (Disclaimer):

এই জীবনীটি উন্মুক্ত সরকারি ওয়েবসাইট, উইকিপিডিয়া, সংবাদ প্রতিবেদন ও সামরিক জার্নাল থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত। ব্যক্তির পরিবারের অনুমতি নিয়ে কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তারিখ ও পদ বিবরণ সূত্রভেদে সামান্য ভিন্ন হতে পারে। কিছু চরিত্রায়ন ও ঘটনা উপলব্ধ সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ থেকে সংযোজিত হয়েছে, যা সাহিত্যিক স্বাধীনতার আওতায় পড়ে। ‘সিলভার টাইগার’ পুরস্কার ও বিদেশি কোর্সের তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সংগৃহীত। এই প্রতিবেদন শুধুমাত্র জ্ঞানগত ও ঐতিহাসিক উদ্দেশ্যে তৈরি — রাজনৈতিক বা সামরিক কৌশলগত ব্যবহার নিষিদ্ধ। সর্বশেষ হালনাগাদ: ২০২৫।